কঠোর সতর্কবার্তা ও হেদায়েত

জিনা বা ব্যভিচারের ভয়াবহতা ও কঠোর সতর্কবার্তা

Mohammad Ayesh Ali  |  পড়ার সময়: ৮ মিনিট  |  সর্বশেষ আপডেট: আগস্ট ২০২৬

ইসলামে যে কয়টি মহাপাপ বা কবিরা গুনাহ রয়েছে, তার মধ্যে শিরক ও হত্যার পরেই জিনা বা ব্যভিচারকে মারাত্মক গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এটি ব্যক্তির ঈমান ও চরিত্রকে ধ্বংস করে, পরিবারে অশান্তির আগুন জ্বালায় এবং সমাজের সার্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার ভিত ধসিয়ে দেয়।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে জিনার নিষেধাজ্ঞা

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জিনাকে কেবল নিষেধই করেননি, বরং জিনার দিকে ধাবিত করে এমন প্রতিটি অনুষঙ্গ ও মাধ্যম থেকেও কঠোরভাবে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

“আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা এক অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।” — (সূরা আল-ইসরা ১৭:৩২)

রহমান-এর প্রকৃত বান্দাদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—

“এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহকে ডাকে না, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচারে লিপ্ত হয় না। আর যে ব্যক্তি এই কাজগুলো করবে, সে শাস্তির সম্মুখীন হবে।” — (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৮)

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জিনা: ছোট পাপ থেকে বড় পাপে রূপান্তর

ইসলাম মন ও ইন্দ্রিয়ের পবিত্রতার ওপর জোর দেয়। মানুষ হঠাৎ করে সরাসরি বড় জিনায় লিপ্ত হয় না; বরং ইন্দ্রিয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে ধাপে ধাপে শয়তানের ফাঁদে পা দেয়।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ বনী আদমের জন্য জিনার অংশ নির্ধারণ করেছেন, যা সে অবশ্যই পাবে। চোখের জিনা হলো তাকানো (নিষিদ্ধ দৃষ্টি), কানের জিনা হলো শোনা (অশ্লীল কথা), জিহ্বার জিনা হলো কথা বলা, হাতের জিনা হলো স্পর্শ করা, পায়ের জিনা হলো পাপের পথে চলা। আর অন্তর কামনা করে ও আকাঙ্ক্ষা করে; পরবর্তীতে লজ্জাস্থান তা সত্য প্রমাণ করে অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে।” — (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৬১২; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৫৭)

জিনার ইহলৌকিক ও পরলৌকিক ক্ষতিসমূহ

১. ঈমানী নূর ও বরকত ছিনিয়ে নেওয়া

ব্যভিচারে লিপ্ত থাকা অবস্থায় মানুষের অন্তর থেকে ঈমানের নূর সাময়িকভাবে উঠে যায় এবং সে শয়তানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যায় (সহীহ বুখারী: ২৪৭৫)।

২. কবরে আগুনের চুল্লির শাস্তি

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মিরাজের রাতে ব্যভিচারী নারী-পুরুষদের শাস্তি দেখানো হয়েছিল। তারা এমন এক উন্মুক্ত তন্দুর বা অগ্নিকুণ্ডের ভেতর উলঙ্গ অবস্থায় জ্বলছিল, যেখানে আগুন নিচে থেকে এসে তাদের দগ্ধ করছিল (সহীহ বুখারী: ১৩৮৬)।

৩. অন্তরের অন্ধকার ও রিজিকে সংকট

গুনাহ মানুষের অন্তরের নূর কেড়ে নেয় এবং জীবনে বরকতহীনতা ডেকে আনে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “নিশ্চয়ই বান্দা তার কৃত পাপের কারণেই তার নির্ধারিত রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০২২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২৪৩৮)

৪. মরণব্যাধি ও সামাজিক দুর্যোগ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সতর্ক করেছেন: “যখন কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা ও ব্যভিচার এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে তারা তা প্রকাশ্যে করতে থাকে, তখন তাদের মাঝে প্লেগ ও এমন সব দুরারোগ্য ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে যা তাদের পূর্বপুরুষদের যুগে কখনো ছিল না।” (ইবনে মাজাহ: ৪০১৯)।

জিনা থেকে বাঁচার কার্যকর ইসলামিক উপায়

ধাপ করণীয় শারঈ উদ্দেশ্য
১. নজর সংযম হঠাৎ দৃষ্টি পড়া মাত্রই চোখ নামিয়ে নেওয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার বাজে পেজ এড়িয়ে চলা। অন্তরে কামনার বীজ রোপণ হওয়া বন্ধ করা।
২. একাকিত্ব পরিহার গায়রে-মাহরামের সাথে বন্ধ ঘরে বা নির্জন চ্যাটে কথা না বলা। শয়তানের তৃতীয় পক্ষ হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা।
৩. দ্রুত বিবাহ সামর্থ্য থাকলে বিলম্ব না করে বিবাহ করা, অন্যথায় নিয়মিত রোজা রাখা। জৈবিক চাহিদাকে হালাল পথে পরিচালিত করা।
৪. সালাতে একাগ্রতা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতে আদায় করা ও নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা। আল্লাহভীতি বৃদ্ধি এবং অশ্লীল কাজ থেকে দূরে থাকা।

অতীতের ভুলের জন্য তওবার দরজা কি খোলা?

কেউ যদি অতীতে অজ্ঞতাবশত বা শয়তানের প্ররোচনায় এই পাপে জড়িয়ে পড়ে থাকে, তবে তার কখনোই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। খাঁটি তওবার (তাওবাতুন নাসুহা) মাধ্যমে আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।

পাপ থেকে মুক্তি ও চারিত্রিক সুরক্ষার দোয়া

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ سَمْعِي، وَمِنْ شَرِّ بَصَرِي، وَمِنْ شَرِّ لِسَانِي، وَمِنْ شَرِّ قَلْبِي، وَمِنْ شَرِّ مَنِيِّي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিন শার্রি সামঈ, ওয়া মিন শার্রি বাসারী, ওয়া মিন শার্রি লিসানী, ওয়া মিন শার্রি ক্বালবী, ওয়া মিন শার্রি মানিয়্যী।
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আমার কানের অনিষ্ট থেকে, চোখের অনিষ্ট থেকে, জিহ্বার অনিষ্ট থেকে, অন্তরের অনিষ্ট থেকে এবং আমার কামপ্রবৃত্তির অনিষ্ট থেকে।”
(আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৫১; তিরমিযী, হাদিস: ৩৪৯২)