ইসলামে চারিত্রিক পবিত্রতা ও লজ্জাশীলতা (হায়া) নিছক কোনো সাধারণ গুণ নয়, বরং এটি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ এবং এটি ঈমানের অন্যতম শাখা। যে সমাজে বা ব্যক্তির মাঝে লজ্জা ও পবিত্রতা থাকে না, সেখানে আত্মিক শান্তি, পারিবারিক স্থায়িত্ব এবং নৈতিক মূল্যবোধ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়।
লজ্জাশীলতা এমন একটি অভ্যন্তরীণ চালিকাশক্তি, যা মানুষকে যেকোনো মন্দ, অশ্লীল এবং পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লজ্জাশীলতাকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “ঈমানের সত্তরেরও বেশি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জাশীলতা (হায়া) হলো ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা।” — (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫; সহীহ বুখারী, হাদিস: ৯)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে লজ্জাস্থানের সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন—
“নিশ্চয়ই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ... এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে।” — (সূরা আল-মুমিনুন ২৩:১-৫)
গুনাহের বীজ অন্তরে রোপিত হয় চোখের অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টির মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা পুরুষ ও নারী উভয়কেই প্রথমে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আন-নূর: ৩০-৩১)। অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি পড়া মাত্রই চোখ ফিরিয়ে নেওয়া আত্মিক পবিত্রতার প্রথম ধাপ।
যৌন পবিত্রতা কেবল বাহ্যিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মনে অশ্লীল কল্পনা ও কুচিন্তা স্থান না দেওয়াও পবিত্রতার অংশ। অন্তরে আল্লাহর সার্বক্ষণিক উপস্থিতির অনুভূতি (ইহসান) বজায় রাখা জরুরি।
পোশাকের শালীনতা মানুষকে অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি ও ফিতনা থেকে সুরক্ষিত রাখে। শরীরের সতর ঢেকে রাখা এবং অশালীন অঙ্গভঙ্গি বর্জন করা হায়ার অন্যতম বহিঃপ্রকাশ।
মানুষ যখন একাকী থাকে, তখন শয়তানের প্ররোচনা সবচেয়ে তীব্র হয়। নির্জনতায় নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করাই প্রকৃত ঈমানদারির প্রমাণ দেয়।
অশ্লীল কথাবার্তা, নোংরা কন্টেন্ট ও খারাপ বন্ধুদের আড্ডা মানুষের অন্তরের লজ্জাশীলতা ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়। নেককার মানুষের সংশ্রব চরিত্রকে মজবুত রাখে।
যৌন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ ও নফসকে দমন করতে নফল সিয়াম পালন করা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশিত একটি শক্তিশালী আত্মিক ঢাল।
| বিবেচ্য দিক | লজ্জাশীলতা ও পবিত্রতা (হায়া) | নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা (ফাহাশা) |
|---|---|---|
| আত্মিক অবস্থা | অন্তরে নূর, প্রশান্তি ও ইবাদতের তৃপ্তি | অপরাধবোধ, হতাশা ও অন্তরের অন্ধকার |
| সামাজিক মর্যাদা | সম্মান, পারিবারিক সুরক্ষা ও বিশ্বাসযোগ্যতা | সামাজিক অবক্ষয় ও দাম্পত্যে অবিশ্বাস |
| আখিরাতের প্রতিদান | জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও আরশের ছায়া | আল্লাহর ক্রোধ ও কঠিন শাস্তির ভয় |
যে ব্যক্তি নিজের জিহ্বা এবং লজ্জাস্থানকে হারাম থেকে সুরক্ষিত রাখবে, তার জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জান্নাতের দায়িত্ব নিয়েছেন—
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমার কাছে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী বস্তু (জিহ্বা) এবং দুই উরুর মধ্যবর্তী অঙ্গের (লজ্জাস্থান) জামিনদার হবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জামিনদার হব।” — (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৪৭৪)