ইসলামে দাম্পত্য জীবনের শারীরিক অন্তরঙ্গতা নিছক জৈবিক চাহিদা পূরণ নয়, বরং এটি একটি সাওয়াবের কাজ ও ইবাদতের অংশ। সুন্নাহ অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং শারীরিক সম্পর্ক অন্তরে প্রশান্তি আনে এবং চরিত্রকে যাবতীয় হারাম থেকে পবিত্র রাখে।
ইসলাম বৈরাগ্যবাদ সমর্থন করে না। পবিত্র বিবাহের মাধ্যমে গঠিত সম্পর্কের শারীরিক মিলনকে ইসলামে সাদাকাহর সমতুল্য সাওয়াব হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাসেও রয়েছে সাদাকাহর সাওয়াব।” সাহাবীগণ আরজ করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কেউ কি তার মনের ইচ্ছা পূরণ করেও সাওয়াব পাবে?” তিনি বললেন, “তোমরা কি মনে করো, সে যদি তা হারাম পথে মেটাত, তবে কি তার গুনাহ হতো না? অতএব, যখন সে তা হালাল উপায়ে পূরণ করে, তখন সে সাওয়াব লাভ করে।” — (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৬)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পরের জন্য প্রশান্তির উৎস এবং পরিচ্ছদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—
“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়া (সংগিনী), যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি লাভ করতে পার এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে বহু নিদর্শন রয়েছে।” — (সূরা আর-রূম ৩০:২১)
“তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ।” — (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৭)
দাম্পত্য মিলনের মাধ্যমে নিজের ও স্ত্রীর দৃষ্টি ও চরিত্রকে হারাম থেকে রক্ষা করার এবং নেক সন্তান লাভের নিয়ত করা।
মিলনের পূর্বে মুখের দুর্গন্ধ দূর করা (মেসওয়াক করা), শরীর পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পছন্দনীয় সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নাত। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই পরস্পরের উদ্দেশ্যে পরিপাটি থাকা অত্যন্ত জরুরি।
হঠাৎ করেই শারীরিক মিলনে লিপ্ত না হয়ে রোমান্টিক কথোপকথন, আদর ও স্পর্শের মাধ্যমে পরস্পরের মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি নেওয়া একটি প্রশংসনীয় ও উত্তম শিষ্টাচার। এটি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যকার ভালোবাসা বৃদ্ধি করে এবং পূর্ণ তৃপ্তি নিশ্চিত করে।
শারীরিক সম্পর্কের ঠিক পূর্বে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শেখানো দোয়া পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা অনাগত সন্তানকে শয়তানের প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের পুরো শরীর দেখা বৈধ। তবে আদব ও লজ্জাশীলতার অংশ হিসেবে মিলনের সময় চাদর বা কোনো আবরণ ব্যবহার করা উত্তম শিষ্টাচার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দাম্পত্য জীবনের একান্ত মুহূর্ত ও শারীরিক সম্পর্কের কথা কোনো তৃতীয় ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করা কবিরা গুনাহ। কিয়ামতের দিন এমন ব্যক্তিদের আল্লাহর কাছে নিকৃষ্ট অবস্থানে রাখা হবে (সহীহ মুসলিম)।
স্বামীকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক তৃপ্তি অর্জিত হয়। শুধুমাত্র নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অনুচিত।
সহবাসের পর গোসল ফরজ হয়। ঘুমানোর প্রয়োজন হলে গোসলের আগে ওজু করে নেওয়া সুন্নাহসম্মত। তবে নামাজ আদায়ের আগে অবশ্যই ফরজ গোসল করে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে।
পবিত্রতা, দাম্পত্য জীবন, সহবাস, গোসল, ওযু এবং ইসলামী যৌন নৈতিকতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের প্রশ্নোত্তর বিভাগটি দেখুন।
প্রশ্নোত্তর দেখুনইসলাম ভালোবাসার প্রকাশে স্বাধীনতা দিলেও কিছু স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করেছে, যা লঙ্ঘন করা হারাম:
| নিষিদ্ধ বিষয় | শারঈ বিধান | হাদিস ও দলীল |
|---|---|---|
| ঋতুস্রাব (পিরিয়ড) চলাকালীন মিলন | সম্পূর্ণ হারাম | সূরা আল-বাকারা ২:২২২ অনুযায়ী ঋতুস্রাব চলাকালীন যৌনমিলন নিষিদ্ধ। ঋতুস্রাব শেষ হওয়ার পর গোসল করে পবিত্রতা অর্জন করলে বৈধভাবে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। |
| মলদ্বার দিয়ে মিলন (Anal Sex) | হারাম ও লানতযোগ্য |
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর মলদ্বারে মিলন করে, সে অভিশপ্ত।”
(সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২১৬২) |
| একান্ত মুহূর্তের কথা প্রকাশ | হারাম ও গুরুতর গুনাহ |
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক থেকে
সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সে ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর
কাছে যায় এবং স্ত্রীও তার কাছে যায়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর
গোপন বিষয় প্রকাশ করে।”
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৩৭) |